খেলনা কেনার আগে যা অবশ্যই জানতে হবে

খেলনা কেনার আগে অবশ্যই যা জানতে হবে

বেবি কর্নার খেলনা
Spread the love

খেলনা বলতে আমরা কি বুঝি?

আমরা শিশুদের খেলনা বলতে হয় ব্যাটারিচালিত গাড়ি বা লাইটযুক্ত কিছুকে বুঝে থাকি।

তবে আমাদের ধারণা ভুল। এই ব্যাপারটা নিয়েই আমার আজকের লেখা।

ব্যাটারি বা লাইটযুক্ত কিছু ছাড়াও রান্না করার যন্ত্রপাতি বা প্লাস্টিকের তীর ধনুককেও শিশুদের খেলনা হিসেবে বুঝি আমরা।

এক্সাক্টলি এগুলো না হলেও প্রায় কাছাকাছি কিছুকেই বুঝে থাকি। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ব্যাটারিচালিত খেলনা!

খেলনা
ছোট বাচ্চাদের কোমল কিছু দিন। ছবিঃআনস্প্লেশ

আসলে আমরা ভুল জানি। তাহলে শিশুদের খেলনা কি?

সোজা কথায় শিশু যেটা দিয়ে খেলে আনন্দ পায় সেটাই তার খেলনা।

সেটা হতে পারে ব্যাটারিচালিত কোনো খেলনা বা হতে পারে ছোট্ট একটা কাগজের টুকরো!

আমার এই কথাটা শুনে অনেকে অবাক হবেন। কারণ খেলনা শব্দটা শুনলে উপরে বলা শব্দগুলো আমাদের মাথায় আসে।

কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় এটা বলা হয়েছে যে শিশুরা যা দিয়ে খেলতে পছন্দ করে সেটাই তার কাছে খেলনা।

ধরুন, মাত্র ১ মাস বয়সী একটা বাচ্চাকে আপনি যদি ব্যাটারিচালিত গাড়ি দেন তাহলে সে এটাতে আগ্রহ পাবেনা। আপনি যখন গাড়ি নিয়ে তার মুখের সামনে ‘বুউউউউ’ আওয়াজ করছেন তখন একটু মনযোগ দিয়ে দেখলে বুঝবেন বাচ্চাটা আপনার দিকে বা গাড়ির দিকে তাকাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সে তার নিজের আঙ্গুল নিয়ে খেলছে। সে তার নিজের হাতের বা পায়ের আঙ্গুল চুষছে। এটাই তার কাছে খেলনা!

আবার ধরুন পাঁচ/ছয় বছর বয়সী বাচ্চাকে আপনি যদি ছাদে ঝুলে থাকা খেলনা দেন তাহলে সে সেটাতে আগ্রহ পাবেনা। সে তখন ব্যস্ত থাকতে পারে সাইকেল চালানো বা ক্রিকেট/ফুটবল খেলায়।

শিশুদের খেলনা
পছন্দের জিনিস দিন। ছবিঃআনস্প্লেশ

উদাহরণ বা এতোগুলো কথা বলার কারণ একটাই কারণ, খেলনা মানেই যে একটা বাচ্চাকে ব্যাটারিচালিত বা চকমকে কিছু দিতে হবে তা না।

এমন জিনিস দিবেন যেন সে এটা দিয়ে খেলতে খেলতে ভেঙ্গে ফেলে! এমন জিনিস দিবেন যা তার একইসাথে খেলা,আনন্দ এবং মেধা বিকাশে কার্যকর হয়

খেলনা ভাঙ্গলে অনেক অভিভাবক রাগ করেন বাচ্চার উপর। কিন্তু একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝবেন সে এটাতে আনন্দ পাচ্ছে। আপনি তাকে বাঁধা দিলে তার আনন্দে বাঁধা পড়ে।

তারমানে সবকিছুই খেলনা ভেবে ভেঙ্গে ফেলুক এটা আপনি বা আমি কেউই চাইবোনা। সেক্ষেত্রে বাচ্চাকে ‘না’ শব্দটা না ব্যবহার করে বুঝাতে পারেন কেন এই জিনিসটা ভাঙ্গা উচিত না।

শিশু
কালারফুল কিছু দিন যা শিশুকে আকৃষ্ট করবে। ছবিঃআনস্প্লেশ

কথাটা একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর থেকে ব্যবহার করবেন। দেড় দুই বছরের বাচ্চা এতো সহজে আপনার কথাকে বুঝবেনা এটা স্বাভাবিক।

তবে বুঝানোর চেষ্টা করে আপনার বাচ্চার মেধার দ্রুত বিকাশে সহযোগীতা করতে পারেন!

বাচ্চাকে যা বলবেন তা তার শিখতেই হবে এমন না। তবে আপনি এই চেষ্টা করে বড় কোনো ক্ষতির হাত থেকেও বেঁচে যেতে পারেন।

কারণ বাচ্চারা অনেকসময় খেলনা ভেবে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নষ্ট করতে পারে।

আমি বলবো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বাচ্চার নাগালের বাইরে রাখুন। এটাই সমাধান।

কোন বয়সের শিশুদের জন্য কেমন খেলনা পছন্দ?

সব বয়সের শিশুরাই খেলনা পছন্দ করে। আমি বয়সের রেঞ্জ অনুযায়ী ছোট অনুমান দিতে পারি শিশুদের কোন বয়সে কেমন খেলনা পছন্দ,

বাচ্চার জন্ম থেকে বসা পর্যন্ত যে খেলনা দিবেন

উপরে ঝুলে থাকা খেলনা পছন্দ। এই বয়সে শক্ত কোনো খেলনা তাদের হাতে দিবেন না। দূর্ঘটনা ঘটতে পারে।

বাচ্চাদের খেলনা
খেলার সাথী থাকলে ভালো। ছবিঃআনস্প্লেশ

আবার এমন কিছু দিবেন না যেটাতে তার শ্বাসরোধ হতে পারে। বাচ্চাদের একটা স্বভাব আছে যেকোনো কিছু হাত দিয়ে ধরেই মুখে দিয়ে দেয়।

নরম বড় কিছু নিজে নিজে মুখে নিয়ে চেপে ধরলে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

যেমন, খেলনা থেকে সুন্দর শব্দ হয় এমন জিনিস দিতে হবে।

তবে শব্দ যেন খুব সফট/মৃদু হয়। বেশি শব্দযুক্ত কিছু দিলে বাচ্চা ভয় পাবে।

বসা থেকে হাটা পর্যন্ত

এটা সেটা ভাঙ্গা, আঁকাআঁকি ইত্যাদি পছন্দ হতে পারে।

টয়
বয়স অনুযায়ী টয় দিন। ছবিঃআনস্প্লেশ

এই বয়সে এমন কিছু দিবেন যেটা ভাঙ্গলে বা ছিঁড়লে অসুবিধা নেই বা বড় ধরনের কোনো অসুবিধা হবেনা।

এই বয়সে নষ্ট করার প্রবণতা বেশি থাকে।

তাই আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু দিবেন। তবে এই বয়সে দামী জিনিস না দেয়াই ভালো।

বই রঙ করা বা এরকম কিছু দেয়া যায়।

হাটা শুরু করলে

এমন জিনিস দিবেন যেটা নিয়ে দৌড়ানো যায়, চালানো যায়। প্রথম কোনো কিছু শিখলে সেটার পূর্ণ ব্যবহার করে শিশুরা।

তাই হাটা শেখার পর তাদের দৌড়াদৌড়িতে কাজে লাগে এমন খেলনাই তাদের বেশি পছন্দ হবে। এই বয়সেও ভাঙ্গার অভ্যাস থাকে শিশুদের!

এরপরের বয়স

থেকে ধীরে ধীরে মেধার বিকাশ ঘটে এমন খেলনা দিবেন।

শিক্ষামূলক খেলনা
মেধা বিকাশে সহায়ক টয় দিন। ছবিঃআনস্প্লেশ

অনেক সময় আমরা অনেক খেলনা দিতে চাইনা। তবে যে খেলনা মানসিক বিকাশ ঘটাতে সহায়তা করবে তা দিতে কার্পণ্য বোধ করবেন না।

খেলনা কতটা উপকারী তা খুব দ্রুতই বুঝতে পারবেন।

ধীরে ধীরে সাইকেল, ক্রিকেট বা ছোট ফুটবলের সরঞ্জাম দেয়া যায় এই বয়সে।

যেসব খেলনা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে

খেলনা যেমন ভালো তেমনি অনেকসময় এগুলো ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ ব্যাপারেও খেয়াল রাখতে হবে।

শিশুদের খেলা
সুন্দর সাউন্ডযুক্ত খেলনাই বাচ্চাদের প্রিয়। ছবিঃআনস্প্লেশ

সামান্য এদিক সেদিক হলেই বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

তাই বয়সভেদে খেলনা বাছাই করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষতিকর কিছু না দেয়া।

তাও ভুলবশত দিয়ে দিলে চোখ কান খোলা রাখবেন যেন দূর্ঘটনা না ঘটে। তবে আবারো বলি যে বিপদজনক কিছু না দেয়াই ভালো।

তাহলে চলুন দেখে নেই কি কি জিনিস শিশুদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে,

  • শিশুদের জন্য আরামদায়ক একটি পণ্য হলো ক্রিব বাম্পার। তবে ক্ষেত্রবিশেষে এগুলো ক্ষতিকর হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো অনিরাপদ এবং শ্বাসরোধ হবারও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
  • কম বয়সী বাচ্চাদের জন্য শক্ত পণ্য যেকোনো সময় দূর্ঘটনা ঘটাতে পারে। তাই এগুলো দেয়ার আগের বুঝেশুনে দিবেন। না দেয়াই ভালো।
  • এমন কোনো কিছু দিবেন না যা আকারে ছোট। অনেক সময় ছোট বাচ্চারা যেকোনো জিনিস মুখে দিয়ে দেয়। আকারে ছোট হলে সেটা গিলে ফেলার মাধ্যমে বড় কোনো দূর্ঘটনা ঘটতে পারে।
  • অনেকে বেবি ওয়াকার কিনেন। তবে এটা যে খুব বেশি নিরাপদ তাও না। বাচ্চার পা দ্রুত চললে বেবি ওয়াকার যেকোনো দিকে দৌড় দিতে পারে। এতে ঘটতে পারে বড় দূর্ঘটনা। তাই এ ব্যাপারে একটু দৃষ্টি রাখবেন। নিজে ধরে হাটা শেখানোই উত্তম।
  • ব্যাটারিচালিত পণ্য না দেয়ার চেষ্টা করবেন। তবে এগুলোর প্রতি বাচ্চাদের অন্যরকম আকর্ষণ থাকে। কিন্তু এগুলোর মাধ্যমেও দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিনে দিলেও নজর রাখবেন।

শেষ কথা

শিশুদের জন্য কিছু কিনলে তার বয়স অনুযায়ী কিনুন। আর যা তা কিনে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

এমন জিনিস দিবেন যেটা তার মন, মেধা বিকাশে সহায়ক হয়।

খেলনা গাড়ি
ছোট ছোট গাড়ি শিশুদের পছন্দ হয়। ছবিঃআনস্প্লেশ

খেলার আনন্দ পাবার সাথে সাথে তার মেধার দ্রুত বিকাশ ঘটাবে এসব জিনিস।

এমন কিছু দিবেন না যেটা তার বয়সের সাথে যায়না। তাহলে সে এটাতে আগ্রহ পাবেনা।

অনেকসময় দেখা যায় বাচ্চারা একটা জিনিসের প্রতি আগ্রহ দেখালে আমরা অন্য কোনো জিনিসের প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করি। এটা ভুল পথ।

সবসময় সে যা চাইবে তাই দিতে হবে ব্যাপারটা এমন না।

তবে মাঝেমাঝে দিবেন। এমন জিনিসটা দিবেন যেটা আসলেই তার কাজে লাগবে।

আমার আরো লেখা পড়ুন এখানে

ধন্যবাদ।