ড্রাইভিং লাইসেন্স

বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে বিস্তারিত জানুন

গাড়ি
Spread the love

ড্রাইভিং লাইসেন্স কি?

ড্রাইভিং লাইসেন্স মানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কতৃপক্ষ (বিআরটিএ) কতৃক নির্দিষ্ট ব্যাক্তিকে নির্দিষ্ট গাড়ি(মোটরযান) বা নির্দিষ্ট শ্রেণির গাড়ি চালানোর পারমিশন দিয়ে যে দলিল প্রদান করা হয় সেটা।

বিশ্বের যেখানেই গাড়ি চালান, লাইসেন্স লাগবেই। তাই যত দ্রুত সম্ভব লাইসেন্স করিয়ে নিবেন। নাহলে পথেঘাটে পুলিশ ঝামেলায় পড়তে হবে।

drivinf liscense bd

যদিও পুলিশ ঝামেলার চেয়ে বড় কথা এটা আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। নিয়ম মেনে গাড়ি চালান। কোনো অসুবিধা হবেনা। এই লেখায় ড্রাইভিং লাইসেন্স ২০২১ নিয়ে আলোচনা করবো।

ড্রাইভিং লাইসেন্স কেন প্রয়োজন?

ড্রাইভ লাইসেন্স

মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর ধারা ৩ অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তি ছাড়া আপনি সর্বসাধারণ বা লোকজনের আনাগোনা আছে এমন এলাকায় গাড়ি চালাতে পারবেন না।

বাংলাদেশে এতো এতো দূর্ঘটনার পেছনে একটু ঘাটাঘাটি করলে দেখা যাবে লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারের সংখ্যা অগণিত। এটা ভয়ানক!

ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলে সেই ড্রাইভার যে দূর্ঘটনা ঘটাবেনা তা না। লাইসেন্স থাকা মানে সে গাড়ি চালানোর অনুমতি পেয়েছে এবং বিআরটিএ কতৃক পরিক্ষিত। এটা দক্ষতার প্রমাণপত্র হিসেবে কাজ করে।

অনেকে এসব লাইসেন্সকে পাত্তা দিতে চান না। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে গাড়ি চালানো শুরু করে দেন। তারপর পুলিশি হয়রানির শিকার হওয়া থেকে শুরু করে মামলা-জরিমানা গুনা লাগে। এসব ভোগান্তি থেকে বাঁচার জন্যই আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগবে।

পেশাদার এবং অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের পার্থক্য

ড্রাইভ

ড্রাইভিং লাইসেন্স করার নিয়ম জানার আগে জানতে হবে পেশাদার এবং অপেশাদার লাইসেন্স কি। টেবিলের মাধ্যমে বুঝালাম যেন বুঝতে অসুবিধা না হয়।

পেশাদার লাইসেন্সঅপেশাদার লাইসেন্স
যে লাইসেন্স দিয়ে কোনো চালক বেতনভুক্ত ড্রাইভার হিসেবে গাড়ি চালান সেই লাইসেন্সই পেশাদার লাইসেন্স।যে লাইসেন্স একজন ব্যক্তিকে বেতনভুক্ত চালক না হয়েও হালকাযান চালানোর জন্য দেয়া হয় তাকে অপেশাদার লাইসেন্স বলে।
এর মেয়াদ ৫ বছর।এর মেয়াদ ১০ বছর।
পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়।পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন নেই।
.৫ বছর পরপর নবায়ন করার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে হয় এবং ব্যবহারিক পরিক্ষাও দিতে হয়।মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে নবায়ন করার জন্য কোনো পরিক্ষার প্রয়োজন হয়না।
এই লাইসেন্সের মাধ্যমে মাঝারি বা ভারী যান চালানোর পারমিশন পাবেন।এটা দিয়ে হালকাযান চালাতে পারবেন।
পেশাদার এবং অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের পার্থক্য

ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবার জন্য যা যা করতে হবে

ড্রাইভার লাইসেন্স

লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রথম ধাপ হলো লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স বা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স। এটার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কতৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে ফর্ম নিয়ে তাতে যথাযত তথ্য দিয়ে জমা দিতে হবে। সাথে কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আপনার বর্তমান ঠিকানার বিআরটিএ অফিসে জমা দিতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন ফর্মের সাথে যে কাগজপত্রগুলো লাগবে সেগুলো হলো,

  • রেজিস্টার্ড ডাক্তার কতৃক মেডিকেল সার্টিফিকেট।
  • পাসপোর্ট/জন্মনিবন্ধন/ন্যাশনাল আইডি কার্ডের(এনআইডি) ফটোকপি। অবশ্যই সত্যায়িত হতে হবে।
  • অপেশাদার লাইসেন্স ফি ৩৪৫ টাকা এবং পেশাদার লাইসেন্স ফি ৫১৮ টাকা। লাইসেন্স ফি বিআরটিএর নির্ধারণ করে দেয়া ব্যাংকে জমা দেয়ার রশিদ লাগবে। অর্থাৎ অফিসে ফর্ম জমা দেয়ার আগে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে রশিদ নিতে হবে। এই ব্যাপারটা অনেকে না বুঝে হয়রানীর শিকার হন। বিআরটিএ নির্ধারিত ব্যাংকের তালিকা এখানে পাবেন।
  • সদ্য তোলা ছবি লাগবে। পাসপোর্ট সাইজ ১ কপি এবং স্ট্যাম্প সাইজ ৩ কপি

এই ডকুমেন্টসসহ ফর্ম জমা দেয়ার পর দুই তিনমাস প্রশিক্ষণ নিতে হবে। প্রশিক্ষণের পর নির্ধারিত সময়, তারিখ এবং স্থানে লিখিত, মৌখিক এবং ব্যবহারিক পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। ব্যবহারিক অর্থাৎ ফিল্ড টেস্ট দিতে হবে।

এসব পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হলে স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করতে হবে। এটার জন্য নতুন আরেকটি ফর্ম, কাগজপত্র এবং ফি আগের মতো অফিসে জমা দিতে হবে। তবে এবার কাগজপত্র একটু ডিফারেন্ট। সেগুলো হলো,

  • রেজিস্টার্ড ডাক্তার কতৃক মেডিকেল সার্টিফিকেট।
  • জন্মনিবন্ধন/পাসপোর্ট/ন্যাশনাল আইডি কার্ডের(এনআইডি) ফটোকপি। অবশ্যই সত্যায়িত হতে হবে।
  • নির্ধারিত ব্যাংকে নির্ধারিত ফি জমাদানের রশিদ। পেশাদার লাইসেন্স ফি ১৬৭৯ টাকা এবং অপেশাদার লাইসেন্স ফি ২৫৪২ টাকা
  • পেশাদার লাইসেন্সের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন।
  • সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ১ কপি ছবি।

পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে কিছু তথ্য

ড্রাইভার

পেশাদার লাইসেন্সের জন্য আপনাকে প্রথমে হালকা ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হবে। হালকা ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়ার পর নূন্যতম তিন বছর পর মিডিয়াম লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন। মিডিয়াম লাইসেন্সের নেয়ার ৩ বছর পর ভারী যান চালানোর লাইসেন্স নিতে পারবেন। নিচে হালকা,মধ্যম এবং ভারী যানের ব্যাপারে কিছু তথ্য দেয়া হলো,

  • হালকা যানের ওজন ২৫০০ কেজির নিচে। এই লাইসেন্সের জন্য বয়স কমপক্ষে ২০ বছর বয়স হতে হবে।
  • মাঝারি যানের ওজন ২৫০০ থেকে ৬৫০০ কেজি। এই লাইসেন্স নিতে হালকা যানের লাইসেন্সের ব্যবহার কমপক্ষে ৩ বছর হতে হবে। প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৩ বছর হতে হবে।
  • ভারী যানের ওজন ৬৫০০ কেজির বেশি। এক্ষেত্রে মধ্যম লাইসেন্স মিনিমাম ৩ বছর থাকতে হবে। এক্ষেত্রে প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৬ বছর হতে হবে।

লাইসেন্স নবায়ন/রিনিউ করবেন যেভাবে

ড্রাইভিং লাইসেন্স কিভাবে

পেশাদার এবং অপেশাদার লাইসেন্সের জন্য নবায়ন প্রক্রিয়া আলাদাভাবে উপস্থাপন করলাম। আশা করি বুঝতে কোনো অসুবিধা হবেনা।

অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন/রিনিউ প্রক্রিয়া

  • প্রথমে বিআরটিএ কতৃক নির্ধারিত ফি জমা দিতে হবে ব্যাংকে। লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হবার ১৫ দিনের মধ্যে হলে ২৪২৭ টাকা জমা দিতে হবে আর ১৫ দিন পার হয়ে গেলে প্রতিবছর ২৩০ টাকা জরিমানাসহ জমা দিতে হবে।
  • তারপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ নির্ধারিত বিআরটিএ সার্কেল অফিসে আবেদন করতে হবে। অর্থাৎ আপনি যেখানে বাস করেন তার আশেপাশের অফিস।
  • আপনার কাগজপত্র যদি ঠিকঠাক থাকে তাহলে সেই দিনেই আপনার বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন হবে। ডিজিটাল ছবি, ডিজিটাল স্বাক্ষর এবং আঙ্গুলের ছাপ নেয়া হবে।
  • স্মার্ট কার্ডের প্রিন্টিং হয়ে গেলে আপনাকে এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে।

পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের নবায়ন/রিনিউ প্রক্রিয়া

  • এক্ষেত্রে আপনাকে আবারো একটা ব্যবহারিক পরিক্ষা দিতে হবে এবং পাশ করতে হবে।
  • পাশ করতে পারলে নির্ধারিত ফি ব্যাংকে জমা দিতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণের ১৫ দিনের মধ্যে আবেদন করলে ১৫৬৫ টাকা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ হবার ১৫ দিন পার হয়ে গেলে প্রতি বছর ২৩০ টাকা জরিমানাসহ)
  • তারপর আবেদন ফর্ম এবং অন্যান্য কাগজপত্রসহ বিআরটিএ সার্কেল অফিসে জমা দিতে হবে।
  • তারপর ডিজিটাল ছবি, স্বাক্ষর এবং আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন হবে।
  • স্মার্ট কার্ড রেডি হলে আপনাকে এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে।

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন/রিনিউ করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

  • আবেদন ফর্ম।
  • মেডিকেল সার্টিফিকেট (রেজিস্টার্ড ডাক্তার কতৃক)।
  • ন্যাশনাল আইডি কার্ড/জন্ম নিবন্ধন/পাসপোর্টের সত্যায়িত ফটোকপি লাগবে।
  • ফি জমার রশিদ।
  • পেশাদার লাইসেন্সের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট।
  • সদ্য তোলা ১ কপি পাসপোর্ট এবং ১ কপি স্ট্যাম্প সাইজের ছবি।

ডুপ্লিকেট ড্রাইভিং লাইসেন্স কিভাবে পাবেন

ড্রাইভিং

ড্রাইভিং লাইসেন্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট। এটা ন্যাশনাল আইডি কার্ড অথবা পাসপোর্টের মতোই শক্তিশালী দলিল। তাই এটাকে যত্নে রাখা প্রয়োজন।

তবে অনেক ক্ষেত্রে লাইসেন্স হারিয়ে যেতে পারে বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সেজন্য ডুপ্লিকেট লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়।

তাহলে চলুন দেখে নেই এই লাইসেন্স কিভাবে পাবেন,

  • লাইসেন্স হারালে যত দ্রুত সম্ভব পার্শ্ববর্তী থানায় সাধারণ ডায়েরি/জিডি করতে হবে।
  • ট্রাফিক ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহ করতে হবে।
  • তারপর এগুলো নিয়ে বিআরটিএ অফিসে ডুপ্লিকেট লাইসেন্সের আবেদন করতে হবে।

ডুপ্লিকেট লাইসেন্সের জন্য যে কাগজপত্রগুলো লাগবে,

  • আবেদন ফর্ম।
  • সাধারণ ডায়েরি/জিডি কপি এবং ট্রাফিক ক্লিয়ারেন্স।
  • ফি জমাদানের রশিদ। হাই সিকিউরিটি লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ফি ৮৭৫ টাকা।
  • সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ১ কপি ছবি।

শেষ কথা

লাইসেন্স

আশা করি আইনের প্রতি আপনি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। আইন মোতাবেক কাজ করুন। লাইসেন্স করে নেয়া আপনার দায়িত্ব। সময়মতো সুন্দরভাবে লাইসেন্স করে ফেলবেন। আমি চেষ্টা করেছি খুঁটিনাটি সবকিছু আপনাদেরকে শেয়ার করার। তারপরেও কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে সেটা করে ফেলবেন। ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন। আর হ্যাঁ, কিছু প্রোডাক্ট রিভিউ দেখে আসতে পারেন এখানে। ধন্যবাদ।

আমাদের আরো ব্লগ