মধু

মধু সম্পর্কে সবকিছু জানুন

অন্যান্য কেনাকাটা স্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্য
Spread the love

লেখায় যা যা আছে

মধু

আজকের এই ব্লগে মধু নিয়ে সবকিছু লিখার চেষ্টা করবো। কোনো তথ্য বাদ গেলে মন্তব্য করে জানাবেন। সেক্ষেত্রে আমরা আপনার সাজেস্ট করা টপিক নিয়ে লিখে ফেলার চেষ্টা করবো।

মধু এক ধরনের মিষ্টি এবং অত্যন্ত ঘন তরল যেটা মৌমাছি অথবা অন্যান্য পতঙ্গ ফুলের নির্যাস থেকে (মাধ্যমে) তৈরি করে। এটা সুপেয় এবং অতি উচ্চমাত্রার ঔষধি গুণ সম্পন্ন একটা ভেষজ তরল। 

বিভিন্ন খাদ্যে চিনির বদলে এটা ব্যবহার করা যায়। এর চমৎকার গন্ধের কারণে অনেকে চিনির বদলে এটাকেই পছন্দ করেন। বাংলাদেশের সুন্দরবনের মধু অনেক পপুলার। এই জায়গার মধুর স্বাদ, সুগন্ধ, রঙ এবং ঔষধি গুণাবলীর জন্য প্রসিদ্ধ। এখানকার বেশিরভাগ মধুই কেওড়া গাছের ফুল থেকে উৎপন্ন হয়। সুন্দরবনের মাওয়ালী সম্প্রদায়ের লোকজন মৌচাক থেকে এটা সংগ্রহ করেন এবং সেটা বিক্রী করে তাদের জীবিকা নির্ধারণ করেন।

ইসলামে মধু

আর সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো মধু কখনই নষ্ট হয়না। হাজার বছর রেখে দিলেও মধুর গুনাগুন নষ্ট হয়না! যারা জানতেন না তারা অবাক হতেই পারেন!

আমরা এখন জানবো মধু খাওয়ার নিয়ম ও উপকারিতা সম্পর্কে। এটা অবশ্যই প্রচন্ড উপকারী সেটা অস্বীকার করার কিছু নেই। প্রথমেই জানবো মধুর উপকারিতা সম্পর্কে।

মধু খাওয়ার উপকারিতা

মধু কত টাকা

মধু খাওয়ার শত শত উপকার উপকারিতা রয়েছে। সব তো বলা সম্ভব না। অনেক অনেক উপকারিতার মধ্য থেকে কিছু মধু খাওয়ার উপকারিতা বলছি।

১। শক্তি বর্ধক

মধু চমৎকার শক্তি বর্ধক হিসেবে কাজ করে। এটা শরীরে তাপ ও শক্তির দারুণ উৎস। মধু আপনার দেহে শক্তি ও তাপ জুগিয়ে আপনার শরীরকে সুস্থ রাখবে।

২। খাবার হজমে সহযোগীতা

মধুতে ভালো পরিমাণে শর্করা থাকে যা সহজে খাবার হজমে সহযোগীতা করে। এতে প্রচুর পরিমাণে ডেক্সট্রিন থাকে যা সরাসরি আপনার রকে প্রবেশ করে এবং এটা সাথে সাথে কাজ করে। পেটের সমস্যার রোগীর জন্য অনেক বেশি উপকারি।

৩। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহযোগীতা করে

মধুতে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স আছে। এটা আপনার কোষ্ঠ্যকাঠিন্য ও ডায়রিয়া দূর করে। ভোরবেলায় এক চা চামচ খাঁটি মধু পান করলে অম্লত্ব ও কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর হয়।

৪। রক্তশূন্যতা দূর করে

মধু আপনার রক্তে হিমোগ্লোবিন গঠনে সাহায্য করে যা রক্তশূন্যতা দূর করতে সাহায্য করে। এতে থাকে প্রচুর পরিমাণ লৌহ, কপার ও ম্যাঙ্গানিজ।

৫। শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের রোগ দূর করে

ফুসফুসের যেকোনো রোগের নিরাময়ে এটা অনেক উপকারি। শ্বাসকষ্টের রোগীদের নাকের কাছে মধু ধরে শ্বাস টান দিলে তারা স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারে। অনেকের ধারণা পুরোনো মধু শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য অনেক ভালো।

৬। অনিদ্রা দূর করে

হানি

যারা অনিদ্রাজনিত সমস্যা আছে তাদের জন্য মধুর উপকারিতা বলে শেষ করা যাবেনা। রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস পানির সাথে দুই চা চামচ মধু খেয়ে নিলে খুব ভালো ঘুম হবে।

৭। যৌন দূর্বলতায় কাজে লাগে

যাদের যৌন দূর্বলতা জনিত সমস্যা আছে তারা প্রতিদিন মধু এবং ছোলা খেলে এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

৮। মুখের স্বাস্থ্য ঠিক রাখে

আপনার মুখের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে এটা বিশেষভাবে উপকারি। এটা দাঁতে ব্যবহার করলে তার ক্ষয় থেকে বাঁচা যায়। রেগুলার মধু পান করলে দাঁতে পাথর জমাট বাঁধাতা বাঁধা দেয়। আপনার দাঁত পড়ে যাওয়া আটকাতে এটা ভালো কাজ করে।

আপনার মুখে যদি ঘা হয় সেক্ষেত্রে এটা মুখ পরিষ্কার রাখে এবং পুঁজ জমতে দেয়না। পানির সাথে মধু মিশিয়ে গড়গড়া করলে মাড়ির প্রদাহ দূর হয়ে যায়।

৯। প্রশান্তিতে কাজে দেয়

হালকা গরম দুধের সাথে এটা মিশ্রিত করে খেলে অনেক প্রশান্তি পাবেন।

১০। শরীরে তাপ উৎপাদনে সাহায্য করে

শীতকালে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে এটা অনেক সাহায্য করে। এক-দুই চামচ মধু এক কাপ ফুটানো পানির সাথে পান করলে শরীর তাজা ও ঝরঝরে থাকে।

১১। পাকস্থলীকে সুস্থ রাখে

মধুর দাম

আপনার হজমে সমস্যা থাকলে মধু কাজে দিবে। এটা আপনার পাকস্থলীর কাজকে জোরালো করে। এটা আপনার বমিভাব, অরুচি, বুকজ্বালা ইত্যাদি দূর করে কারণ এটা হাইড্রোক্রলিক অ্যাসিড ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। 

১২। পানিশূন্যতা দূর করে

গরমে বা ডায়রিয়া হলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। পানিশূন্যতা দূর করতে এক লিটার পানিতে ৫০ মিলি মধু মিশিয়ে পান করলে দেহের পানিশূন্যতা দূর করে।

১৩। দৃষ্টিশক্তিকে ভালো রাখে

এটা চোখের জন্য খুবই ভালো। মধু এবং গাজরের রস একসাথে মিশিয়ে খেলে দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকে।

১৪। রূপচর্চায় মধু

মধুকে রুপচর্চায় মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মুখের ত্বকের মসৃণতা বজায় রাখতে মধু ব্যবহার করতে পারেন।

১৫। গলার স্বরকে পরিষ্কার রাখে

মধু আপনার গলার স্বরকে রাখবে পরিষ্কার, সুন্দর এবং মধুর।

১৬। তারুণ্য ধরে রাখার জন্য

মধুর ছবি

তারুণ্য ধরে রাখতে এটা বিশেষভাবে উপকারি। এটার এন্টি অক্সিডেন্ট ত্বক এবং ত্বকের রংকে সুস্থ রাখে। আপনার ত্বকের মধ্যে ভাজ পড়া রোধ করে এবং বয়স্ক দেখানো থেকে রক্ষা করে। শরীরের তারুণ্য ও শক্তি বৃদ্ধি করে।

১৭। হাড় ও দাঁত ভালো রাখে

মধুতে রয়েছে ক্যালসিয়াম। আর আমরা জানি ক্যালসিয়াম হাড়, দাঁত, চুলের গোড়া শক্ত রাখে। একইসাথে নখের ভঙ্গুরতা রোধ করে এবং ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করে।

১৮। উচ্চ রক্তচাপ কমায়

এক চামচ রসুনের সাথে দুই চামচ মধু মিশিয়ে সকাল সন্ধ্যা দুইবার খেলে আপনার উচ্চ রক্তচাপের থেকে রক্ষা করে। তবে সকালে খেলে অবশ্যই মূল খাবারের এক ঘন্টা আগে খাবেন।

১৯। রক্ত পরিষ্কার করে

এটা আপনার রক্ত পরিষ্কারে সাহায্য করে। দুই চামচ মধুর সাথে এক গ্লাস গরম পানি ও এক চামচ লেবু মিশ্রিত করুন। প্রতিদিন সকালে এই মিশ্রনটি খাবেন পেট খালি করার আগে। এটা রক্তনালিও পরিষ্কার রাখে। এছাড়াও এটা রক্ত উৎপাদনে সাহায্য করে।

২০। হৃদরোগ থেকে রক্ষা করে

মধুর গুনাগুন

এক বা দুই চামচ মধুর সাথে এক চামচ মৌরি গুড়া মিশ্রিত করুন। এটা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এটা হৃৎপেশির কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং পেশিকে সবল রাখে।

২১। রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে

মধু শরীরের রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। একইসাথে শরীরের ভিতরে বা বাহিরে যেকোনো ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণ সামলে শরীরকে সুস্থ রাখে। এটাতে আছে ব্যাক্টেরিয়া প্রতিরোধী উপাদান।

২২। ওজন কমাতে সাহায্য করে

মধু খেলে পাকস্থলীতে বাড়তি গ্লুকোজ তৈরি করে যেটা মস্তিষ্কের সুগার লেভেল বাড়িয়ে দেয়, এর ফলে মেদ কমানোর হরমোন নিসৃত হয় এবং মেদ কমাতে সাহায্য করে।

২৩। বুদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে

ঘুমানোর আগে এক চামচ মধু খেলে মস্তিষ্ক অনেক ভালোভাবে কাজ করে। এতে মস্তিষ্ক খুব দ্রুত কাজ করে এবং বুদ্ধি বাড়তে সাহায্য করে।

মধু খাওয়ার নিয়ম 

মধু খাওয়ার উপকারিতা

মধু খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি নিয়ে কথা বলবো এখন। ভুলভাবে এটা খেলে খুব একটা উপকার পাওয়া যায়না। তাহলে চলুন মধু খাওয়ার সঠিক নিয়ম জেনে নেই,

  • খুব গরম পানি বা খুব গরম দুধের সাথে মধু মিশিয়ে খাবেন না। হালকা গরম পানির সাথে মিশিয়ে খাবেন।
  • মধুকে সরাসরি গরম করতে বা রান্না করতে যাবেন না!
  • মধুকে দুধের সাথে খেতে চাইলে আগে দুধকে একটু নরমাল অবস্থায় আনুন। তারপর তা পান করুন।
  • সকালে খালি পেটে এটা খাওয়া সবচেয়ে উপকারি।
  • পুরাতন মধু নতুন মধুর চাইতে বেশি কার্যকর।
  • এসিডিটি বা পেটের গ্যাস কমাতে লেবুর রসের সাথে মধু মিশ্রিত করে পান করুন।
  • আপনার যদি হজমে সমস্যা থাকে তাহলে ভারী খাবার খাওয়ার আগে মধু খেয়ে নিন। হজমের সমস্যা কমে যাবে।
  • মধুর সাথে দারুচিনির গুড়া মিশিয়ে খেলে রক্তনালীর সমস্যা দূর হয়। 
  • নিয়মিত মধুর সাথে দারুচিনির গুড়া মিশিয়ে খেলে হার্ট এটাকের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।
  • লিভার পরিষ্কার রাখতে এবং ওজন কমাতে লেবুর রসের সাথে মধুর মিশ্রণ অনেক উপকারি।
  • যৌন সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে নিয়মিত ছোলার সাথে এটা মিশিয়ে খেতে পারেন।
  • সর্দি, কাশি থেকে মুক্তি পেতে বাসক পাতার রস ও দুই চা চামচ মধু মিশিয়ে খেতে পারেন। এছাড়াও এক চামচ মধু ও এক চামচ তুলসীপাতার রস মিশিয়ে খেলে কাশি কমে।
  • গুড়ের রস ও মধু একসাথে মিশিয়ে খেলে বমি ভাব বন্ধ হয়।

খাঁটি মধু চেনার উপায়

মধু খাওয়ার উপকারীতা

এতো ভেজালের ভিড়ে খাঁটি মধু চেনা অনেক কষ্টকর। তবে আমরা সঠিক গাইডলাইন দেয়ার চেষ্টা করবো যাতে আপনি সহজে খাঁটি জিনিস জকিনতে পারেন। খাঁটি মধু চেনার উপায়,

  • মধুতে কখনো বাজে বা কটু গন্ধ থাকবেনা। খাঁটি মধুর গন্ধ আকর্ষনীয় ও মিষ্টি হয়।
  • খাঁটি মধুর স্বাদ মিষ্টি হয়। কখনোই এতে ঝাঁঝালো ভাব থাকবেনা।
  • এক টুকরা ব্লটিং পেপার নিয়ে সেটাতে কয়েক ফোঁটা মধু নিন। যদি কাগজ সেটা শুষে নেয় তাহলে বুঝে নিবেন এটা খাঁটি নয়।
  • ঠান্ডার সময় বা শীতকালে খাঁটি মধু জমে দানা বেঁধে যায়।
  • খাঁটি মধু চেনার আরেকটা দারুণ উপায় হচ্ছে মোমবাতি দিয়ে টেস্ট। মোমবাতির সলতেটা মধুতে ডুবিয়ে নিন। তারপর সেটাতে আগুন ধরান। যদি আগুন ধরে যায় তাহলে মধুটি খাঁটি। কিন্তু যদি আগুন না জ্বলে তারমানে মধুতে পানি মেশানো হয়েছে।
  • অনেকদিন ঘরে রেখে দেয়া মধুতে চিনি জমতে পারে। বয়ামটি সহ মধুকে গরম পানিতে কিছুক্ষণ রেখে দেখুন। যদি মধু খাঁটি হয় তাহলে তা গলে গিয়ে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। কিন্তু নকল হলে এরকম কিছু হবেনা।
  • এক টুকরা সাদা কাপড়ে মধু মাখিয়ে নিন। ৩০ মিনিটের মতো এভাবেই রেখে দিন। তারপর মধু মাখা অংশটা ধুয়ে দেখুন দাগ যায় কিনা। যদি দাগ চলে যায় তাহলে বুঝবেন এটা খাঁটি।
  • বাটি বা গ্লাসে পানি নিয়ে তার মধ্যে এক চামচ মধু নিন। যদি পানির সাথে এটা সহজেই মিশে যায় তাহলে বুঝে নিবেন এটা নকল। খাঁটি মধুর ঘনত্ব পানির চেয়ে বেশি হওয়ায় তা পানির সাথে মিশেনা। 

কাদের মধু খাওয়া উচিত এবং উচিত না?

মধু হাদিস

চলুন এখন জেনে নেই কাদের মধু খাওয়া উচিত এবং কাদের উচিত না।

  • এক বছরের নিচের বাচ্চাকে মধু খাওয়াবেন না। এমনকি খাবারের সাথে মিশিয়েও খাওয়াবেন না।
  • ডায়াবেটিক রোগীকে মধু খাওয়ানো যাবেনা। কারণ তাদের ব্লাডের ইনসুলিনের অ্যাকটিভিটিস কম হয় এবং মধু খাওয়ার পরে তারা সেই সুগারকে কন্ট্রোল করতে পারবে না।
  • ক্যান্সারের রোগীদের জন্য ফলের রসের সাথে মধু খাওয়াতে পারেন।
  • গর্ভবতীদের জন্য এটা অনেক উপকারি। কারণ গর্ভবতী মায়েদের অনেক ক্যালোরি প্রয়োজন।
  • বাচ্চাদের শরীরের শক্তি যোগাতে মধু খাওয়াতে পারেন।

পরিশেষে

মধুর গুন

মধু খাওয়ার গুনাবলি শেষ করা যাবেনা আসলে। আরো অনেক অনেক গুন রয়েছে। তবে এটা ঠিক যে এটা আপনাকে অনেক সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে। নিয়মিত মধু পান করুন এবং সুস্থ থাকুন। একইসাথে মনোবল আর শরীরের শক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে এটা। ধন্যবাদ।

আমাদের সাইটে ভিজিট করে আরো ব্লগ পড়ুন।

আরো লেখা পড়ুন